আমাদের দেশে বুদ্ধিজীবি হতে হলে চমৎকার একটা প্রসেসের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। বুদ্ধিজীবি হওয়ার সবচেয়ে প্রাথমিক ধাপ হচ্ছে তথাকথিত অসাম্প্রদায়িক হওয়া। আর মজার ব্যাপার হচ্ছে এইখানে অসাম্প্রদায়ীকতা বলতে অবশ্যই ইসলামের অনুশাসন এবং ইসলামী মূল্যবোধ-এর বিপক্ষে কথা বলতে হবে- হিন্দু, খ্রীস্টান বা বৌদ্ধ ধর্মের কোন সমালোচনা করা যাবে না। কোন জায়গায় ভিন্ন ধর্মের মানুষ মারা গেলে একটি জ্বালাময়ী বক্তব্যদিয়ে নিজেকে অসাম্প্রদায়িক প্রমাণ করতে হবে! নিজ ধর্ম ব্যাতীত অন্যসকল ধর্মের আচার-অনুষ্ঠানে নিজেকে হাজির করে, হাস্যোজ্জল ছবি দিয়ে নিজেকে অসাম্প্রদায়িক প্রমাণ করতে হবে। আমাদের বুদ্ধিজীবিরা এতো চমৎকার ও নিরপেক্ষ হয়ে থাকেন যে ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান কিংবা সিরিয়াতে প্রতিদিন হাজার হাজার বেসামরিক মানুষের হত্যা নিয়ে কোন প্রকার মুখনিঃসৃত বাণী পাওয়া যায়না তাদের কাছ থেকে, অথচ ইউরোপ, আম্রিকাতে একটি মানুষের অকাল মৃত্য তাদেরকে খুব করে ভাবায়, খুব করে কাঁদায়। তাদের ধারনা ইসলামকে ধারন করে কিংবা নিজ ধর্মকে অক্ষুন্ন রেখে অন্য ধর্মের মানুষের জন্য কাজ করাকে 'বুদ্ধিজীবি বোদ্ধা' বলে না, এভাবে প্রগতীশীল হওয়া যায় না! আমাদের বুদ্ধিজীবিরা যখন এই 'ইসলাম বিরোধী' পরীক্ষায় পাশ করে তাদেরকে তখন একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে প্রমাণ করা লাগে। বুদ্ধিজীবি হওয়ার এই ধাপটাতে তাদেরকে একজন 'মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি'র বলে প্রমাণ করতে হয়। তা প্রমাণ করতে গিয়ে নিজেকে একজন আওয়ামী লীগ এর ঘোরতর সাপোর্টার ও কথায় কথায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলতে হয়। অথচ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যে একটি গণতান্ত্রীক ভোট দানে রাজনৈতিক সরকার গঠন- কেউ একথা বলে না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যে ইউপি নির্বাচনে শ'খানেক মানুষ মারা না যাওয়া- একথা কেউ বলেনা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যে ছাত্রলীগের চমৎকার রাজনৈতিক আদর্শ যা আজ শুধু কাগজে কলমে লিখা আছে , প্র্যাক্টিসে নেই- এ কথা কেউ বলেনা! আমাদের বুদ্ধিজীবিদের আলোচনার বিষয় শুধু 'ইসলাম কি ভাবে নারীদের অধিকার কেড়ে নিয়েছে’, কেনো সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ’ইসলাম’ এবং ’বিসমিল্লাহ’ ডিলিট করা একান্তই অপরিহার্য, 'ডঃ ইউনুস-এর নোবেল পুরুষ্কার পাওয়া কেনো উচিত হয় নি, কিংবা ’শান্তি’-তে শেখ হাসিনার নোবেল পুরুষ্কার পাওয়ার চুড়ান্ত যোগ্যতা থাকার যুক্তি- এই সব নিয়ে কথা বলতে বলতে আমাদের ’বুদ্ধিজীবি’দের মুখের থুথুতে সামনের সবকিছু ভিজে যায়। আমাদের এই তথাকথিত বুদ্ধিজীবি ও প্রগতীশীলদের চমৎকার ভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন আহমেদ ছফা। তার মতে- '' আমাদের দেশে যারা মৌলবাদী তারা শতকরা একশো ভাগ মৌলবাদী। কিন্তু যারা প্রগতিশীল বলে দাবী করে থকেন তাদের কেউ কেউ দশ ভাগ প্রগতিশীল, পঞ্চাশ ভাগ সুবিধাবাদী, পনেরো ভাগ কাপুরুষ, পাঁচ ভাগ একেবারে জড়বুদ্ধিসম্পন্ন''! এই জ্ঞ্যানপাপী বুদ্ধিজীবি আর প্রগতীশলরা যখন আমাদের আদর্শ হয়ে দেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন কিংবা প্রতিদিন টিভি খুলেই জাতী তাদেরকে দেখছে আর তাদের থেকে শিখছে তবে দেশ কোন দিকে যাবে তাতো বলাই বাহুল্য! আমাদের এই যে অবক্ষয়, মূল্যবোধের হাহাকার এসব দেখলে মাঝে মধ্যে মনেহয়- আমরা আসলে ঠিক পথেই আছেই...আমাদের দেশে এমনি হওয়ার কথা ছিলো! যখনই নেটে ইউরোপের সুন্দরতম দেশগুলোর র্যাংক দেখি, তার মধ্যে স্কটল্যান্ড এর নাম থাকেই। অনেকদিন থেকেই ভাবি যাবো। কিন্তু সময় হয় না। আবার আমার যখন সময় হয়, তখন সংগী-সাথীদের সময় হয় না। একা একা যেতেও ইচ্ছা করে না। তো শেষ পর্যন্ত যাওয়া হলো। গাড়ী ভাড়া করা, বিভিন্ন যায়গার হোটেল ভাড়া করা, দর্শণীয় জায়গাতে যেখানে যেখানে টিকেট লাগবে তা করা, রুট প্ল্যান - সবকিছুই করা হলো একে একে। ঠিক হলো প্রথমে আমরা স্কটল্যান্ড এর রাজধানী এডিনবরাতে যাবো, ঘোরাঘুরি এবং রাএিযাপন এডিনবরাতেই। রাত ৩টায় যাএা শুরু যাতে করে পুরা দিনটা কাজে লাগাতে পারি। সবাইকে বলে দেয়া হলো সকাল সকাল ঘুমিয়ে পরার জন্য, বিশেষ করে আমাকে এবং বিশ্বকে, কারন আমরা দু’জন হলাম এই ট্রিপের ড্রাইভার! প্রায় ৪০০ মাইল রাস্তা, ৮ ঘন্টামতো ড্রাইভ। টেনশানে রাতে শান্তিমতো ঘুমাতে পারলাম না। টেনশানের কারন হচ্ছে বিশ্ব। জন্মের অলস, আর ঘুমাতে খুব পছন্দ করে। আমি নিশ্চিত যখন ওর চালানোর সময় হবে তখন কিছুক্ষন পরেই বলবে, ভাই আর পারি না, একটু রেস্ট নিতেই হবে। আর এমন কথা কেউ বললে তার উপর এ’কয়জন মানুষের জানের দায়িত্ব দেয়া যায় না। যাই হোক, ভালোয় ভালোয় বেলা ১১:৩০ এর দিকে এডিনবরায় আমাদের হোটেলে এসে পৌছলাম। সময় নষ্ট না করে তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে গেলাম এডিনবরা ক্যাস্ ল দেখতে। লক্ষ লক্ষ বছর আগে শীতল হওয়া একটা আগ্নেয় পাহাড়ের উপর এই দূর্গটা তৈরি করা হয়। ১২ শতাব্দীতে তৈরি করা এই দূর্গকে ঘিরেই শহরটা গড়ে উঠেছে। ১. ভারত পাকিস্তান খেলা হলে কেউ কেউ ভারতের সাপোর্ট করে, কেউ কেউ পাকিস্তানের। আমি এখন ক্রিকেটখেলা দেখাকে সময় নষ্ট মনে করি সুতরাং কোন দল কি করল অত শুনতে চাই না। তবে বাংলাদেশ জিতলে ভাল লাগে। কিন্তু আমাকে অযথাই অনেকে খোঁচা দেয় "তুমি তো ভারতের সাপোর্টার"। এর কারণ হল আমার মা ভারতীয় মেয়ে। ১৯৭০ সালে তারা বাংলাদেশে আসেন। বিভিন্ন কারণ ছিল। এক নাম্বার কারণ ছিল, আমার দুই মামা বাংলাদেশে পড়ালেখা করতেন আর আরেক মামা পশ্চিম পাকিস্তানে। দুই নাম্বার কারণ ছিল, বাংলাদেশী হিন্দুরা বাংলাদেশে যতটা সাচ্ছন্দবোধ করে জীবন যাপন করে ইন্ডিয়ান মুসলিমরা সেভাবে জীবন যাপন করতে পারেন না। আমার একদম ছোট মামা লিউকেমিয়ায় এবং আম্মুর নিঃসন্তান বড়চাচা মারা যাবার পর নানাজি তার স্ত্রী, ভাবী ও তিন মেয়েকে নিয়ে বাংলাদেশে চলে আসেন মাইগ্রেট করে। ইন্ডিয়া থেকে আসার পরপরই যুদ্ধের মধ্যে পড়েন। তখন আমার এক মামা যুদ্ধও করেন। ইন্ডিয়া থেকে আগত এক মামা তো জীবন্ত এক পাকি সেনাকে পুঁতে ফেলেছিলেন। আম্মু আব্বুর দুইজনের থেকে শুনি মুক্তিযোদ্ধার কথা। আব্বু যোদ্ধা ছিলেন, সেটাতে গর্ববোধ করি। কিন্তু আম্মুকে নিয়েও আমি গর্ববোধ করি, কারণ তারা আসার পর যুদ্ধ শুরু হয়, অনেক কষ্ট করেছেন, যুবক ছেলেদের ধরে মেরে ফেলা হচ্ছিল, তাদের সামনেই এক মামাকে ব্রাশ ফায়ার করতে গিয়েও করেনি, কপাল গুণে না হয় বেচে গিয়েছিলেন। কিন্তু এত কষ্টের পরেও আম্মুকে দেখিনি কখনো বলতে ইন্ডিয়ায় ভাল ছিল। দেশ স্বাধীন হবার পর প্রভাত ফেরী হত,সেই গান শুনে তার চোখেও পানি আসত, খুশির আনন্দ,মুক্তির আনন্দ। ইন্ডিয়াতে এখনো আম্মুদের দুইটা বাড়ি আছে কিন্তু কখনো তো দেখিনি মামা খালাদের কাউকে ওই বাড়ির জন্য হা পিত্যেস করতে। অথচ বাড়িগুলো বর্ধমানের প্রাইম লোকেশনেই!কিন্তু তারপরও আমাকে খোঁচা মেরে বলতে আসবে তুমি তো ভারতের সাপোর্টার! হ্যা, আমি ভারতের সাপোর্টার তা হয়েছে কি? আর পাকিস্তানের সাপোর্টার হলেই বা কি? খেলা তো খেলাই! এটা নিতান্ত বিনোদন। কোন সেলিব্রেটি যেন বলেছিলেন, বাংলাদেশে শিশুদের প্রথম থেকেই একটা দেশের সংস্কৃতিকে ঘৃণা করতে শেখানো হয়।কথাটা উনি কিন্তু ইমোশন থেকে বলেন নি। এখন আমরা কি করব? কোন পাকি দেখলেই মেরে ফেলবো? কিছু মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি এমনই। অন্যের কথা কি বলব, আমি নিজেও এক সময় চ্যাট আওয়ারে প্রচুর বিদেশিদের সাথে চ্যাট করতাম। যেই শুনতাম পাকি,সাথে সাথে ইগ্নোর করতাম। কিন্তু পরে কিছু পাকি ফ্রেন্ড হয়েছিল, তারা ৭১ নিয়ে লজ্জিতও! আবার এদিকে খুলনার ভাল মার্কেট বলতে নিউমার্কেট। খুলনায় যারা কখনো যান নি তাদের বলি, খুলনার নিউমার্কেট টা ঢাকা নিউমার্কেটের মতই কিন্তু সাইজে ছোট, গোছালো আর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। কিন্তু ঢাকার নিউমার্কেটে যেমন বিভিন্ন শ্রেণীর ক্রেতা পাবেন, বেশিরভাগই মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত। খুলনার নিউমার্কেটে নিম্ন মধ্য বিত্ত ক্রেতা পাবেন না। কারণ সব জিনিসের অত্যন্ত দাম। এটা আমি একারণেই বলতে পারছি কারণ ঢাকা খুলনা আমি যাওয়া আসার উপরেই থাকি। মাঝে একদিন পেপারে পড়লাম খুলনা থেকে ডিরেক্ট কোলকাতার বাস ছেড়েছে বিআরটিসির। গতকাল চোখে পড়ল এমন একটা বাস বডিটা গ্রীন লাইনের আর বাস বিআরটিসির। খুলনা নিউমার্কেটে গিয়ে তাজ্যব বনে গেলাম।ক্রেতা নাই বললেই চলে! ১৫০০ রুপি দিয়ে একটা ড্রেস কিনে এনে যদি ৫০০০ টাকা দিয়ে বিক্রি করে তবে কেন মানুষ খুলনা নিউমার্কেটে যাবে!বাস আছে, ইজি ওয়ে, কোলকাতায় গিয়েই শপিং করা বেটার। এইসব দেখে মনেহয় মানুষ আসলে কি চায় নিজেও জানেনা! শুধু অন্যের গায়ে কাঁদা লাগাতে ব্যস্ত, কিন্তু জায়গামত ধরলে এদেরকে কাঁদায় পুরো শরীর ভরিয়ে ফেলা যায়। আবার এত ইন্ডিয়ার পণ্য বর্জন করুন বলতে বলতে আবার উনাদের চিকিৎসা ইন্ডিয়া ছাড়া হয়না! ২. আমি মোবাইল থেকে কারো মন্তব্যের উত্তর দিতে গেলে মন্তব্যটা জায়গামত পোস্ট হয়না, পোস্ট হয় মন্তব্যের শেষে ফুল ভার্শনে ক্লিক করলেও ফুল ভার্শন আসে না এটা কেবলই আপনাদের চিন্তা, ও মানসিকতার সীমাবদ্ধতাকে নির্দেশ করে। সন্তান জন্ম নেয়ার পূর্ব পর্যন্ত আপনাদের দ্বায়িত্বগুলো থাকে অনেকটা আবেগি অনেকটা কৌতূহলী। এখানে আপনার প্রধান দ্বায়িত্ব ও কর্তব্য শুরু হয় সন্তান জন্ম নেয়ার পর থেকে। আপনাদের অনেকেই আশা করেন আপনার সন্তানটি বড় হয়ে কর্পোরেট দুনিয়াতে প্রভাব বিস্তার করবে/ বড় সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে সমাজে নামডাক হবে/ বিশাল ব্যবসায়ী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করবে। আপনার সন্তানের জন্য আপনি বিশাল স্বপ্ন দেখতেই পারেন কিন্তু একটা বিষয় মাথায় রাখবেন জিবনটা কিন্তুু আপনার না একান্তই আপনার সন্তানের। সে এখন একজন সতন্ত্র ব্যক্তিসত্ত্বা, সুতরাং নিজের মত করে সবকিছুতেই নাক গলাতে যাবেন না। ভাবতে পারেন মা- বাবা হিসেবে তো আপনারা তার ভালই চান। সত্যিই বলতে ভাল'র সঙ্গাটাই আমরা জানি না। মা-বাবা বলেই কি সন্তানের ব্যক্তি স্বাধিনতায় হস্তক্ষেপ করাটা ভাল নাকি তাকে নিজের মত করে গড়ে উঠতে দেয়াটা ভাল? প্রায়ই মা-বাবা সন্তানের জন্য এটা করেন ওটা করেন বলতে শুনা যায় (শ্রদ্ধা জানাচ্ছি তাদের ভালবাসার প্রতি) কিন্তুু সন্তানরা কি তাদের মা-বাবার জন্য কম সেক্রিফাইস করে? একটা ছেলে / মেয়ে যখন শুধুমাত্র তার পরিবারের কথা ভেবে ভালবাসার মানুষটির কথা কাউকে জানতে না দিয়ে দরজার ওপাশে বোবাকান্না করে সেটা কি তার মা-বাবার জন্য সেক্রিফাইস করা নয়? যখন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানটি নিন্তাত্যই কোন সখের জিনিস পূরন করার আগেই বাবার আর্থিক সীমাবদ্ধতা জেনে সেই স্বপ্নকে নিজের মধ্যই দাফন করে দেয় সেটা কি সেক্রিফাইস নয়? তার বন্ধুরা যখন নতুন জামা কিনে, ল্যাপটপ কিনে, কোথাও ঘুরতে যায় তখন তার আবেগি মনটাকে কাল্পনিক নানান কিছু দিয়ে বুঝিয়ে রাখাটা কি শুধুই আপনাদের জন্য নয়? এরকম হাজারও স্বপ্ন প্রায়ই তারা বিসর্জন দেয় শুধু আপনাদের ভালবাসে বলে, যেটা আপনারা চিন্তা করতেও পারেন না। আপনারা শুধুই বলতে পারেন, তোমাকে অমুকের মত হবে। অমুকের ছেলে দেখ কত ভাল রেজাল্ট করছে/ কত ভাল চাকরি করছে/ অনেক টাকা কামাই করছে। তমুকের মেয়েটা এখন মেডিকেলে পরছে/ বুয়েটে পড়ছে। এইসব অপ্রাসঙ্গিক উদাহরন দিয়ে প্লিজ তাদেরকে কনফিউজড করবেন না । সবাইকে বুয়েট/ মেডিকেলে পড়া সম্ভব না। কাউকে না কাউকে তো অন্যান্য কলেজ/ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেই হবে এই সহজ বিষয়টা কেন মেনে নিতে পারেন না। কেমনটা হবে যদি আপনার সন্তান কোনদিন আপনাকে প্রশ্ন করে বসে অমুকের বাবা এত বড় অফিসার/ এত দামি গাড়ি/ এত বড় বাড়ির মালিক কিন্তু তোমার এইসব নাই কেন? কি উত্তর দিবেন তাকে? সন্তানদের চিন্তা ভাবনার প্রতি যত্নশীল হোন, তাদের তাদের অবস্থান থেকে বুঝতে চেষ্টা করুন। তবেই তাদের প্রতি যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারবেন। জিবনে টাকা কামানোর অনেক উপায় রয়েছে, শুধু টাকা থাকলেই সেটাকে সফলতা বলে না। আপনারা একটা সময় বৃদ্ধ হবেন হয়তো তখন আপনার সেবাযত্ন করার জন্য আপনার সন্তানের টাকা দিয়ে ভাল ডাক্তার/ চিকিৎসা কিংবা ভাল একটা বৃদ্ধাশ্রম কপালে জুটবে। মা-বাবার প্রতি সন্তানের ভালবাসা, শ্রদ্ধা, সম্মান, দ্বায়িত্ববোধ সম্পূর্ন ভিন্ন বিষয়। ব্যাপারটা যতদ্রুত উপলদ্ধি করতে পারবেন ততই আপনাদের জন্য মঙ্গল হবে। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে যেন সঠিক জ্ঞান দান করেন। আমাকে যদি কেউ প্রশ্ন করেন, স্বাধীনতা পরবর্তি বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় চমক কিংবা মিরাকল কী ছিল? আমি কয়েকটা নাম বলব: যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, ক্রীকেটের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিশ্বপরিচীতি, শাহবাগ আন্দোলন নামক একটি বিরল শহুরে মধ্যবিত্ত গণজোয়ার, বাংলাদেশের একজন মানুষের নোবেল জয়, বাংলাদেশী হিসেবে কারো এভারেষ্ট জয়, এককালের তলাহীন ঝুড়ির অধুনা ৪ লক্ষ কোটি টাকার বার্ষিক বাজেট দেবার দুঃসাহস, পদ্মা সেতুর মতো একটি অত্যন্ত দুঃসাহসিক চ্যালেঞ্জ দেবার মতো দাপট। আরেকটা মিরাকল আছে-গার্মেন্টস নামক একটি বিষ্ময়। কী, চোখ কুঁচকে ফেললেন? সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন লেখাটা আর পড়ে সময় নষ্ট করবেন না? যদি তা করেন তবে আরেকটু কষ্ট করে পড়ুন। হ্যা, গার্মেন্টস শিল্প বাংলাদেশের বিগত চার দশক ধরে সর্ববৃহৎ বিষ্ময় বলে আমি বিশ্বাস করি। যেহেতু গার্মেন্টসের গুণকীর্তন আজকে আমার মুল উদ্দেশ্য নয় তাই আমি লেখা সংক্ষিপ্ত করতে এর সপক্ষে মাত্র ৫ টি যুক্তি দেব:- ১.যেই প্রায় ৫০ লক্ষ (ডাইরেক্ট) কর্মী এখানে কাজ করেন তারা গার্মেন্টস না থাকলে কোথায় কাজ পেতে পারতেন? ভাবুনতো দেশে এখন সরাসরি বেকার ২৬ লক্ষ। এই ৫০ লক্ষ তার সাথে যোগ হয়ে এটি ৭৬ লাখ হত। ২.পরোক্ষভাবে আরো প্রায় ১ কোটি মানুষ গার্মেন্টস রিলেটেড ব্যাকওয়ার্ড ও ফরোয়ার্ড লিঙ্কেজে কাজ করেন। তাদের ও ডিরেক্ট কর্মীদের জিডিপিতে মোট আর্থিক অবদান কত? ৩.এর মধ্যে যে ৮০% মেয়ে শ্রমিক আছেন, গার্মেন্টস না থাকলে তাদের আজকের অবস্থান কী থাকত? ৪.বাংলাদেশের মোট রপ্তানী আয়ের প্রায় ৮২ ভাগ (২৮ বিলিয়ন ডলার) দখল করেছে গার্মেন্টস শিল্প। এইটা না থাকলে আমরা ৪ লক্ষ কোটি টাকার বাজেট দেবার সাহস কোথা হতে পেতাম? ৫.ক্রীকেট ছাড়া আরো যে জিনিসটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পরিচীতি এনে দিয়েছে সেটা হল গার্মেন্টসের “মেড ইন বাংলাদেশ” ব্রান্ডিং। আমার আজকের লেখার মূল উপজীব্য অন্য। বাংলাদেশের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফেনোমেননটির ভবিষ্যত, অতিশীঘ্রই যেসব ভয়াবহ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে এই খাতটি, তার একটি নন-একাডেমিক স্ট্যাডি আমার উদ্দেশ্য। খুব সাদাচোখে এই খাতের একজন সাধারন কর্মী হিসেবে নির্মোহ কিন্তু বাস্তববাদী বিশ্লেষন করাই আমার লেখার উদ্দেশ্য। অনেকে বলতে পারেন চ্যালেঞ্জ তো থাকবেই। হ্যা থাকে তবে যদি কোনো দেশের রপ্তানি আয়ের ৮২% ই দখল করে থাকে একটিমাত্র খাত আর সে খাতে প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষ (প্রত্যক্ষভাবে) রুজি রুটির জন্য নিয়োজিত থাকে তাহলে সেই চ্যালেঞ্জের গুরুত্ব আর দশটা বিষয়ের চেয়ে অনেক বেশি চিন্তার বিষয়। যদি লেখাটি আমাদের বর্তমান, ভবিষ্যত উদ্যোক্তাবৃন্দ কিংবা উদ্যোক্তা হবার স্বপ্ন দেখছেন এমন মানুষেরা কিংবা যারা এই সেক্টরের নীতি নির্ধারনী পর্যায়ের কর্মী-তারা পড়েন এবং আমাদের রক্ত জল করা এই শিল্পটিকে বাঁচাতে, টিকিয়ে রাখতে, এগিয়ে নিতে এই লেখাটি বিন্দুমাত্র কাজে আসে তবে আমার পরিশ্রম স্বার্থক হবে। তবে অনেকে বলতে পারেন, আপনি উদ্যোক্তা বা নীতিনির্ধারকদের এত জ্ঞান যদি দিতে পারেন তবে নিজে কেন উদ্যোক্তা হন না? ভাই, উদ্যোক্তা হবার জন্য যতগুলো ক্রাইটেরিয়া ফিল আপ করতে হয় তার মধ্যে এই জ্ঞানটুুকু শুধু যথেষ্ট নয়। আরো অনেকগুলো বিষয় থাকতে হয়ই। তার মধ্যে অন্যতম ভাইটাল বিষয় হল “ডিটারমিনেশন-উদ্যোক্তা হবার” যেটা আমার নেই। তাই উদ্যোক্তা হওয়া আর হয়ে ওঠে না। আমি আমার দীর্ঘ ১২ বছরের চোখে দেখা গার্মেন্টসের নানান চড়াই উৎড়াই আর গার্মেন্টসের সাথে ওৎপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকার অভিজ্ঞতার আলোকে বর্তমান বিশ্বের ও আমাদের দেশের সার্বিক প্রেক্ষাপটে আমাদের এই প্রাণভোমরা শিল্পটির সামনে শীঘ্রই স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী যেসব চ্যালেঞ্জ আসছে তার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরন দিতে চাই: ১.ব্রেক ইভেন অব ইন্ডাস্ট্রি: আমাদের স্বাধীনতা পরবর্তি মিলিয়ন ডলারের বাজেট আজ অলরেডি ৪ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। একবার যেহেতু ৪ লক্ষ হয়েছে সেটা ইকোনোমির নিজস্ব ধর্ম অনুযায়ী আর ৩ লক্ষ হবার কোনো সুযোগ নেই। বরং এটা ক্রমাগত বড় হতেই থাকবে। এই ভলিউমের একটি ইকোনোমি বড় হতে হতে একসময় তার প্রধান খাতগুলো ব্রেক ইভেনে চলে যায় অর্থাৎ ওই দেশের অর্থনীতির প্রধান খাতগুলো তাদের একক অবদানের দিক দিয়ে ব্রেক ইভেন পয়েন্টে চলে যায়। তারপর আর ওই খাত নির্ভর থেকে ইকোনোমি চলতে পারে না। ইকোনোমিকে তার গতিধারা বজায় রাখতে আরো বেশি সফিসটিকেটেড খাত, সুপার ভ্যালুর খাতে মাইগ্রেট করতেই হয়। তার মানে দাড়াল, বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নিজের টিকে/এগিয়ে যাবার স্বার্থেই একটা পর্যায়ে তার আজকের প্রধান খাতকে পেছনে ফেলে নতুন নতুন অধিকতর লাগসই খাত খুঁজে নিতে হবে। তার মানে দাড়াল গার্মেন্টস শিল্পকে ক্রমাগত সংকুচিত বা আরো অপ্রধান খাতে পরিনত হবার কিংবা ধীরে ধীরে নতুন লাগসই খাতের কাছে পিছিয়ে পড়তে হবে। বিশ্বাস হচ্ছে না? জাপান, ইউএসএ, কোরিয়াকে দেখুন। তারাও তো একসময় গার্মেন্টস করত। আজ তারা সেখানে আছে কি যেখানে তারা আরো ৪০ বছর আগে ছিল? (এরপরও বিশ্বাস না হলে ১৪ জুনের প্রথম আলোতে জনাব বদিউল আলম মজুমদারের এই কলামটি পড়ে দেখতে পারেন-http://epaper.prothom-alo.com/view/dhaka/2017-06-14/11) ২.ইউরোপের জনসংখ্যা হ্রাস: শুনলে হাস্যকর মনে হতে পারে তবে ইউরোপ (যেটি আমাদের গার্মেন্টস রপ্তানীর প্রধান হাব) সেখানকার জনসংখ্যার ক্রমহ্রাস আমাদের জন্য একটি থ্রেট। থ্রেটটি খুব ধীর হলেও স্টেডি। মানুষ কমলে কনজাম্পশন কমবে। তাতে আমাদের অর্ডার ফ্লো কমতে বাধ্য। অনেকে বলবেন, মানুষ কমছে তাতে কী, মাইগ্র্যান্টরাতো গিয়ে সে গ্যাপ পূরণ করছে তো। স্যরি, মাইগ্রান্টরা আমাদের রপ্তানী করা ২৫ ডলারের শার্ট-প্যান্ট কেনার ক্ষমতা খুব কম রাখে। ৩.মজুরীর আপেক্ষিক বৃদ্ধি: আমাদের গার্মেন্টস খাতের বিশ্ববাজারে প্রতিযোগীতা সক্ষমতার একটি অন্যতম প্রধান পজেটিভ চলক হল আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলোর চেয়ে তুলনামুলক আপেক্ষিক কম শ্রম মজুরী। খুব ভাল করে খেয়াল করুন। আমি বলছি না “কম মজুরী” । আমি বলছি “তুলনামুলক আপেক্ষিক কম মজুরী”। এর বাইরে আরো কয়েকটি কমপারেটিভ বিজনেস ড্রাইভার আছে আমাদের যা অন্য কখনো বলব। তো, এই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চলকটি খুব বেশিদিন আর অন্যান্য প্রতিযোগীদের চেয়ে পিছিয়ে থেকে আমাদের কমপারেটিভ কম্পিটিটিভনেস বাড়াবে-সেটা আর জোর গলায় বলা যাচ্ছে না। মজুরী বাড়তে বাড়েতে একটা ব্রেক ইভেনের বাইরে চলে গেলে আমাদের জন্য কম্পিটিশনটা ওপেন হয়ে যাবে। এটিও বাংলাদেশের জন্য বিশাল একটি চ্যালেঞ্জ হতে যাচেছ। ন্যুনতম মজুরী আরো বাড়ানো উচিৎ কিনা-সেটি একটি ডিফারেন্ট ইস্যূ। এখানে আমি শুধু মজুরী বৃদ্ধির শুধু নির্দিষ্ট একটি ইমপ্যাক্ট বোঝানোর চেষ্টা করছি। ৪.একর্ড ও এলায়েন্সের জন্ম বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাতের জন্য অনেক ভাল কিছুর জন্ম দিলেও তা একই সাথে আবার অনেকগুলো অভিশাপেরও দরজা খুলে দিয়েছে। এটা মনে করার কোনো কারন নেই, এই দুটি বেনিয়া জোট আমাদের জন্য বিধাতার দূত হয়ে এসেছে। তাদের নীল দংশনে কিভাবে গার্মেন্টস খাত ধুঁকছে তার বিস্তারিত বর্ণনা এখানে দিলাম না। এই দুটি জোটের সরাসরি ও পরোক্ষ অভিশাপে ঠিক কী কী বিপদ ঘনাচ্ছে তার বিবরন দিতে আরেকটি গল্প লিখতে হবে। শুধু একটা পরিসংখ্যান বলি, বাকিটা আপনি বুঝে নিন। একর্ড ও এলায়েন্সের ছোবলে প্রায় ২৫০ টি চালু কারখানা বন্ধ হয়েছে। তাদের প্রেসক্রিপশনে বাংলাদেশের যতগুলো কারখানা তাদের শ্রমপরিবেশ সংশোধনের তালিকায় আছে তাদের পুরো কাজ বাস্তবায়নে খরচ করতে হবে প্রায় ১০-১৫ হাজার কোটি টাকা। এই টাকার যোগান দেয়া আর তার রিটার্ন পাওয়ার চ্যালেঞ্জ আপনি না মানুন, বাংলাদেশের গার্মেন্টসের সাথে জড়িত এমন নীতিনির্ধারকরা হাড়ে হাড়ে জানেন। ৫.অপরিকল্পিত, অনিয়ন্ত্রিত, দূরদর্শীতাহীন ও কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যাতিত গামেন্টস শিল্প কারখানার সংখ্যাবৃদ্ধি বা বিদ্যমান ইউনিটগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি (উৎপাদনশীলতার সাথে মিশিয়ে ফেলবেন না) এদেশের গার্মেন্টস শিল্পের জন্য অচীরেই তীব্র প্রতিযোগীতা সৃষ্টি করতে যাচ্ছে দেশের ভিতরেই। যার সুবিধা নেবে বায়াররা, বাংলাদেশ নয়। একতো দেশে অর্ডারের পরিমান কমছে। পাশাপাশি সেই অর্ডারও ভাগ হবে, কারন অর্ডার চাই-এমন ক্ষুধার্ত পেট বাড়ছে। ৬.বায়ারদের চাপে প্রতিনিয়ত পোশাকের গ্রস মূল্য কমতে থাকা আমাদের জন্য ভয়াবহতম থ্রেট। যারা বলেন গার্মেন্টস ওনাররা প্রচন্ড রকম প্রোফিট করেন শুধু সেসব অন্ধদের জ্ঞাতার্থে বলি, আমাদের বার্ষিক টার্নওভার যদি ১০০ টাকা হয় তাহলে তার ৬৫ টাকাই কাঁচামালের দাম বাবদ বিদেশী সাপ্লায়ারকে দিয়ে দিতে হয়। বাকি ৩৫ টাকা হতে যাবতীয় খরচ (বেতন, বোনাস, ভাঙচুর ব্যায়, ঘুষ, কন্সট্রাকশন, অপচয় এমনকি টয়লেট পেপারের দাম ইত্যাদি) মেটাতে হয়। গার্মেন্টস একমাত্র ব্যবসা যেখানে প্রতিটি SPI অর্থাৎ প্রতিটি স্টিচ বা সুঁইয়ের ফোড় হিসাব করে পয়সা আয় করতে হয়। ৭.যে ভলিউমে ও গতিতে আমাদের গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি কলেবরে বেড়েছে তার সাথে তাল রেখে বাড়েনি ব্যাকওয়ার্ড ও ফরোয়ার্ড লিংকেজ। ফলে হাইপোথাইরয়ডিজমের রোগীর মতো আমাদের ব্যাসিক কাট টু প্যাক শিল্প টিপিক্যালী যাকে দেশের মানুষ ”গার্মেন্টস” নামে চেনে তার মাথা হচ্ছে বিশাল কিন্তু হাত পা অবয়ব বড় হয়নি। পরিণতি তো বুঝতেই পারছেন। সামাল দিতে গিয়ে লাভের গুড় পিপড়েকে দিতে হচ্ছে মানে টোটাল টার্নওভারের একটা বড় অংশ বিদেশী র ম্যাটেরিয়াল সাপ্লাইয়ার ও বিদেশী কনসালট্যান্ট/এক্সপার্টকে দিয়ে দিতে হচ্ছে। এই বিদেশ নির্ভরতা আমাদের প্রতিযোগীতার সক্ষমতার আবার এক বড় প্রতিবন্ধক যেটার নাম লীড টাইম। আমাদের লীড টাইম চায়নার দ্বিগুন হলে আমরা কী করে চায়নার সাথে টিকব? ৮.শুনতে স্বার্থপর মনে হতে পারে তবু বলছি। দেশের শিক্ষার হার যত বাড়বে তত গার্মেন্টস খাত রিলেটিভ নেগেটিভ ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টরের শিকার হবে। কেন? এই খাতের মূল প্রাণশক্তি কিন্তু এখানকার অশিক্ষিত লেবার শ্রেণী যারা মুলত প্রোডাকশন করে। শিক্ষার হার ও সুযোগ যত বাড়বে তত এই খাতে শ্রমিক সরবরাহ কমবে। তার উপর সরকার এখন মেয়েদের (যারা গার্মেন্টসের প্রধানতম ম্যানপাওয়ার) তাদের ডিগ্রি পর্যন্ত স্টাইপেন্ড/সাবসিডি/খরচ দিচ্ছে বা দিতে যাচেছ। এতে তাদের গার্মেন্টসে আসা কমবে। শিক্ষিত মানুষ নিশ্চই কাতারে কাতারে গার্মেন্টস শ্রমিক হতে চাইবে না। এই মুহুর্তে এমনিতেই এখানে ঘাটতি আছে ১০-১৫ লাখ শ্রমিকের। সেটা যদি আরো বাড়তে থাকে (শিক্ষার হার বাড়ায় আর নতুন কারখানা বাড়ায়) তবে আমাদের প্রোডাকশন ব্রেক ইভেনের ধাক্কায় পড়বে। ৯. অদ্ভুৎ মনে হলেও একটা সত্যি কথা বলি। দেশের ক্রমাগত অর্থনৈতিক অগ্রগতিও গার্মেন্টসের জন্য একধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরী করছে। ভাবুনতো, আপনি যত ধনী হবেন, গামেন্টস শিল্প হতে ততই কি আপনি আগ্রহ হারিয়ে আরো তুলনামুলক আকর্ষনীয় বা আপাতঃ প্রেস্টিজিয়াস পেশায় যেতে চাইবেন না? এতে করে গার্মেন্টস তার কোয়ালিটি ম্যানপাওয়ার দিন দিন আরো হারাবে। মানতে পারলেন নাতো? ধরেন আমাদের অর্থনীতি জাপানের মতো বড় হল। তো বাঙালী একজন নাগরিক যার পার হেড ইনকাম গড়ে ১৬০০ ডলার হতে বেড়ে ১৬,০০০ ডলার হয়ে গেল তিনি কি আজকের মতো এত সহজে গার্মেন্টসে (আই মিন কারখানা শিল্পে) কাজ করতে চাইবেন? আরো উদাহরন দেই। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো কেন তৃতীয় বিশ্ব হতে শ্রমিক নেয়? একটু দু’য়ে দু’য়ে চার মিলান। আপনারা জানেন কিনা জানি না। গার্মেন্টসের ৫০-৫৫ লাখ শ্রমিকের প্রায় ৮০ ভাগ নারী অথচ এখানকার নিয়ন্ত্রক স্ট্যাফদের প্রায় ৯৫ ভাগ পুরুষ। কেন জানেন? ইনিশিয়ালী মেয়েরা এই পেশায় এলেও তারা বেশ কয়েক বছর চাকরী করে নিজেদের দক্ষতার বেস্ট সময়টাতে চাকরী ছেড়ে সংসারী হয়ে যায় নানান বাস্তবতায়। ফলে বেস্ট এফিশিয়েন্ট ম্যানপাওয়ারের অপটিমাম সার্ভিস বঞ্চিত হয় সেক্টর। ইকোনোমিক গ্রোথ এই খাতে ম্যানপাওয়ার সাপ্লাইয়ের বিদ্যমান ঘাটতিকে আরো বাড়াবে। ১০.ইমেজ সংকট: আপনি হয়তো মানবেন না। তবু বলছি, এই দেশে তথাকথিত জ্ঞানী, বিশেষজ্ঞ আর ক্রেজি দেশপ্রেমিক মানবতাবাদীদের সংখ্যা ও তাদের নির্বোধ প্রেশারগ্রূপ এফেক্ট গার্মেন্টস সেক্টরের জন্য অশনী সংকেত। নানান চেষ্টা স্বত্বেও এই গ্রূপটার কারনে গার্মেন্টস বিরাট ইমেজ সংকটে আছে যা আমাদের প্রতিযোগীতা সক্ষমতাকে আরো কমাবে। এরা ইকোনমি বা ইন্ডাস্ট্রির কিছু বুঝুক বা না বুঝুক, অষ্টপ্রহর গার্মেন্টস শিল্পের যতরকম নেগেটিভ নিউজ, ডিসকাশন করা যায় করে যাবে। এতে করে কেউ যদি উপকৃত হয় সেটা হচ্ছে আমাদের প্রতিযোগী দেশসমূহ-ভিয়েতনাম, ভারত, কম্বোডিয়া, চায়না ও অন্যান্যরা। এক হলি আর্টিজেন কান্ডে পরবর্তি কয়েকমাসে কত পরিমান অর্ডার শিফটিং হয়েছে সেটা আমরা জানি। ১১.সেই আশির দশক হতে শুরু করে আজকে গার্মেন্টসের ভলিউম কত হয়েছে নিশ্চই জানেন? বিজিএমইএ লক্ষ্য নির্ধারন করেছে ২০২১ সাল নাগাদ এই খাতের রপ্তানী আয় ২৮ বিলিয়ন হতে ৫০ বিলিয়নে নিয়ে যাবে। নিশ্চই তা হবে। তবে বর্তমানের প্রেক্ষিতে একটু মিলিয়ে নিই। গার্মেন্টস সেক্টরের তিনটি প্রধানতম চ্যালেঞ্জ যদি আমি বলতে চাই তবে তার একটা অবশ্যই হবে মানবসম্পদের ঘাটতি। শ্রমিকের তো ঘাটতি আছেই। তার সাথে আরও আছে যোগ্য, দক্ষ, স্মার্ট, ভিশনারী, কারিগরি, ম্যানেজমেন্ট কর্মীর ঘাটতি। ভাল করে শুনবেন-ঘাটতি আছে বলেছি, টোটাল অনুপস্থিতি আছে বলিনি। এই খাতকে নেতৃত্ব দিয়ে তাকে ৫০ বিলিয়নের বন্দরে পৌছাতে যে পরিমান ও যেই টোটাল ক্যালিবারের হিউম্যান রিসোর্স দরকার তা আমাদের নেই আর তা তৈরীর কোনো নিশ্চিত ব্যবস্থাও আমরা এখনো করতে পারিনি। তো কারা নেতৃত্ব দেবে আমাদের ম্যানডেটরি ম্যাসিভ গ্রোথ রিকয়ারমেন্টকে? ১২.যদি আপনি মৌলিক ইকোনমি বুঝে থাকেন তাহলে নিশ্চই জানবেন, প্রতিটি অার্থিক খাত বা চলককে টিকে থাকতে হলে নির্দিষ্ট ও ধারাবাহিক মার্জিনাল গ্রোথ রেট ধরে এগোতে হয়। আমাদের বিজনেস ডাটা বলছে, বিগত ৫ বছর ধরে আমাদের এই খাতের মার্জিনাল গ্রোথ রেট হ্রাস পাচ্ছে। ৫ বছর আগে যা ছিল 6-7% সেটা ২০১৭ তে মাইনাস রেটে যা ভয়ঙ্কর ভীতিপ্রদ। ১৩.এবার যেটির কথা বলব সেটি বলার পর বহু প্রগতিবাদী ও সমাজসেবক আমাকে গালি দিতে নেমে পড়বেন। তবু বলছি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ইউএসএ যারা আমাদের গার্মেন্টস পণ্যের সিংহভাগের ক্রেতা তারা ক্রমাগতভাবে গার্মেন্টসে ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার জন্য চাপ তৈরী করছে। ট্রেড ইউনিয়ন ইস্যুতে (সাথে আরো কিছু ফালতু ইস্যুতে) ইউএসএ ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা স্থগিত করে রেখেছে বছর তিনেক। ইইউও সেই রাস্তায় হাটছে। জিএসপি না থাকায় আমাদের প্রতিযোগীতা সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। আবার ওটা পেতে গেলে ইউনিয়ন দিতে হবে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ট্রেড ইউনিয়ন একদমই আশির্বাদ বয়ে আনবে না। বরং (বিশ্বাস করুন) ট্রেড ইউনিয়ন বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের কফিনে শেষ পেরেক ঠোকা হবে। ইউনিয়ন করার মতো ম্যাচিওরড কর্মীবাহিনী আমাদের তৈরী হয়নি। আগে শিল্পটাকে বাঁচান। তারপর দেখা যাবে এর ফাইন টিউনিং। আমি ১৩টি বললেও আসলে আরো অসংখ্য চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। এতক্ষণের আলোচনার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত গার্মেন্টস উদ্যোক্তাগণ, উদীয়মান উদ্যোক্তাগন, সিনিয়র পলিসি মেকারগণ, উচ্চ পদস্থ কর্মীবৃন্দ এবং হবু উদ্যোক্তাগণ বলতে পারেন, এগুলো অতিশয় কল্পনা বা বাস্তবতাবিবর্জিত। অথবা ভাবতে পারেন এইসব থ্রেট ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই আমরা বিগত ৪০ বছর টিকে আছি। হ্যা আছি, আরো কিছুদিন থাকবও (আমি কামনা করি যেকোনো উপায়ে হোক আমরা আরো শতবছর টিকে থাকবই) তবে অতীতের যেকোনো সময়ে এইসব চ্যালেঞ্জের গুরুত্ব ও চাপ, পোষ্ট রানাপ্লাজা-শারমিন ইস্যু আর একর্ড এলায়েন্স যুগের মতো ছিল না। উপরের প্রতিটি চ্যালেঞ্জ অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে মোকাবেলা করা আরো প্রচন্ড চ্যালেঞ্জিং হয়ে যাবে। এখন প্রশ্ন হল, আমরা এটা মোকাবেলা করব কিভাবে? কিভাবে করব সেটা বলার আগে এটা আগে স্বীকার ও বিশ্বাস করতে হবে যে, থ্রেট ও চ্যালেঞ্জটি সত্যিই আসছে এবং তার কামড় খুব প্রচন্ড হবে। তাহলেই আমরা সেটিকে সত্যিকার ও সিরিয়াসলি মোকাবেলা করতে পারব, অন্তত চেষ্টা করতে পারব। আমি যেহেতু বড় বড় থিংক ট্যাঙ্ক সংগঠনের একাডেমিশিয়ান বা প্রথাগত গবেষক নই, তাই সমাধানের উপায়গুলোও হয়তো প্রথাগত ও গোছালো বলতে পারবনা। খুব সংক্ষেপে বলছি:- বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাতকে তৈরী হতে হবে। সবদিক হতে। বিশ্বের বাজারে যত শক্ত প্রতিযোগী আছে তাদের সাথে আমাদের প্রতিযোগীতার সক্ষমতা বাড়াতে হবে সবক্ষেত্রে। আমাদের যতটুকু আছে তার থেকে অপটিমাম ব্যবহার করতে হবে। প্রচুর এনার্জি, মানি, টাইম ও অপর্চুনিটি ওয়েস্টেজ হয় আমাদের। সেটাকে ভার্চুয়ালী শুন্যের কোঠায় আনার লক্ষ্য নির্ধারন করতে হবে। যেকোনো প্রকারেই হোক, ম্যানপাওয়ার সাপ্লাইয়ের ঘাটতি পুরন করতেই হবে-লেবার ও ম্যানেজমেন্ট কর্মী-দুটোই। গার্মেন্টস সেক্টর লেবার ইনটেনসিভ খাত। এখানকার উন্নতির যেকোনো উদ্যোগের মুলেই হল ম্যানপাওয়ারের সক্ষমতা। একটি গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠান এক্ষেত্রে এককভাবে কী করতে পারবে? হ্যা, বিপদ তো তার একারও আছে তাই তার এককভাবেও অনেক কিছু করবার আছে। তাকে প্রথমেই বিপদ আসছে-সেটা রিয়েলাইজ করতে হবে, বিপদের ধরন ও কারন বুঝতে হবে, নিজের ইন্টেলেকচুয়াল ও টেকনিক্যাল-উভয় ধরনের ম্যানপাওয়ারকে সিংক্রোনাইজড ও ডেটোনেট করতে হবে সব প্রিপারেশনসহ (বিপদ আসার অনেক আগে)। প্রোএকটিভ ব্যবস্থা নিতে হবে, ওয়েস্টেজ আটকাতে হবে, ব্রান্ডিং করাতে হবে নিজের। আমি খুব সংক্ষেপে এইচআর প্রফেশনাল হিসেবে বলব, আপনি অত্যন্ত স্মার্ট, হাইলি কোয়ালিফাইড এবং প্রফেশনাল কর্মী হায়ার করুন। তারাই যা করার করবে অটোমেটিক্যালি। এ্যামেচার আর হাতুড়েদের দিয়ে গার্মেন্টস আর চলবে না। মনে রাখতে হবে, সারভাইভাল ফর দি ফিটেষ্ট। তবে আমি একটি নিজস্ব বিশ্বাসকে (অবৈজ্ঞানিক শোনাবে হয়তো) সবশেষে বলব এই আসন্ন দুর্যোগ হতে বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাতের যুদ্ধজয়ের সর্ববৃহত হাতিয়ার। সেটা হল, এক;গার্মেন্টস সেক্টর ও এর যোদ্ধাদের লড়াকু স্বকীয়তা, অতীত সাফল্য। দুই ও সবচেয়ে ভাইটাল; বাঙালী কোনদিন কারো কাছে নত হয়নি। বাংলাদেশকে হারানো গেছে, পরাজিত করা যায়নি-এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় মন্ত্র। আমাকে যদি কেউ প্রশ্ন করেন, স্বাধীনতা পরবর্তি বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় চমক কিংবা মিরাকল কী ছিল? আমি কয়েকটা নাম বলব: যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, ক্রীকেটের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিশ্বপরিচীতি, শাহবাগ আন্দোলন নামক একটি বিরল শহুরে মধ্যবিত্ত গণজোয়ার, বাংলাদেশের একজন মানুষের নোবেল জয়, বাংলাদেশী হিসেবে কারো এভারেষ্ট জয়, এককালের তলাহীন ঝুড়ির অধুনা ৪ লক্ষ কোটি টাকার বার্ষিক বাজেট দেবার দুঃসাহস, পদ্মা সেতুর মতো একটি অত্যন্ত দুঃসাহসিক চ্যালেঞ্জ দেবার মতো দাপট। আরেকটা মিরাকল আছে-গার্মেন্টস নামক একটি বিষ্ময়। কী, চোখ কুঁচকে ফেললেন? সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন লেখাটা আর পড়ে সময় নষ্ট করবেন না? যদি তা করেন তবে আরেকটু কষ্ট করে পড়ুন। হ্যা, গার্মেন্টস শিল্প বাংলাদেশের বিগত চার দশক ধরে সর্ববৃহৎ বিষ্ময় বলে আমি বিশ্বাস করি। যেহেতু গার্মেন্টসের গুণকীর্তন আজকে আমার মুল উদ্দেশ্য নয় তাই আমি লেখা সংক্ষিপ্ত করতে এর সপক্ষে মাত্র ৫ টি যুক্তি দেব:- ১.যেই প্রায় ৫০ লক্ষ (ডাইরেক্ট) কর্মী এখানে কাজ করেন তারা গার্মেন্টস না থাকলে কোথায় কাজ পেতে পারতেন? ভাবুনতো দেশে এখন সরাসরি বেকার ২৬ লক্ষ। এই ৫০ লক্ষ তার সাথে যোগ হয়ে এটি ৭৬ লাখ হত। ২.পরোক্ষভাবে আরো প্রায় ১ কোটি মানুষ গার্মেন্টস রিলেটেড ব্যাকওয়ার্ড ও ফরোয়ার্ড লিঙ্কেজে কাজ করেন। তাদের ও ডিরেক্ট কর্মীদের জিডিপিতে মোট আর্থিক অবদান কত? ৩.এর মধ্যে যে ৮০% মেয়ে শ্রমিক আছেন, গার্মেন্টস না থাকলে তাদের আজকের অবস্থান কী থাকত? ৪.বাংলাদেশের মোট রপ্তানী আয়ের প্রায় ৮২ ভাগ (২৮ বিলিয়ন ডলার) দখল করেছে গার্মেন্টস শিল্প। এইটা না থাকলে আমরা ৪ লক্ষ কোটি টাকার বাজেট দেবার সাহস কোথা হতে পেতাম? ৫.ক্রীকেট ছাড়া আরো যে জিনিসটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পরিচীতি এনে দিয়েছে সেটা হল গার্মেন্টসের “মেড ইন বাংলাদেশ” ব্রান্ডিং। আমার আজকের লেখার মূল উপজীব্য অন্য। বাংলাদেশের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফেনোমেননটির ভবিষ্যত, অতিশীঘ্রই যেসব ভয়াবহ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে এই খাতটি, তার একটি নন-একাডেমিক স্ট্যাডি আমার উদ্দেশ্য। খুব সাদাচোখে এই খাতের একজন সাধারন কর্মী হিসেবে নির্মোহ কিন্তু বাস্তববাদী বিশ্লেষন করাই আমার লেখার উদ্দেশ্য। অনেকে বলতে পারেন চ্যালেঞ্জ তো থাকবেই। হ্যা থাকে তবে যদি কোনো দেশের রপ্তানি আয়ের ৮২% ই দখল করে থাকে একটিমাত্র খাত আর সে খাতে প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষ (প্রত্যক্ষভাবে) রুজি রুটির জন্য নিয়োজিত থাকে তাহলে সেই চ্যালেঞ্জের গুরুত্ব আর দশটা বিষয়ের চেয়ে অনেক বেশি চিন্তার বিষয়। যদি লেখাটি আমাদের বর্তমান, ভবিষ্যত উদ্যোক্তাবৃন্দ কিংবা উদ্যোক্তা হবার স্বপ্ন দেখছেন এমন মানুষেরা কিংবা যারা এই সেক্টরের নীতি নির্ধারনী পর্যায়ের কর্মী-তারা পড়েন এবং আমাদের রক্ত জল করা এই শিল্পটিকে বাঁচাতে, টিকিয়ে রাখতে, এগিয়ে নিতে এই লেখাটি বিন্দুমাত্র কাজে আসে তবে আমার পরিশ্রম স্বার্থক হবে। তবে অনেকে বলতে পারেন, আপনি উদ্যোক্তা বা নীতিনির্ধারকদের এত জ্ঞান যদি দিতে পারেন তবে নিজে কেন উদ্যোক্তা হন না? ভাই, উদ্যোক্তা হবার জন্য যতগুলো ক্রাইটেরিয়া ফিল আপ করতে হয় তার মধ্যে এই জ্ঞানটুুকু শুধু যথেষ্ট নয়। আরো অনেকগুলো বিষয় থাকতে হয়ই। তার মধ্যে অন্যতম ভাইটাল বিষয় হল “ডিটারমিনেশন-উদ্যোক্তা হবার” যেটা আমার নেই। তাই উদ্যোক্তা হওয়া আর হয়ে ওঠে না। আমি আমার দীর্ঘ ১২ বছরের চোখে দেখা গার্মেন্টসের নানান চড়াই উৎড়াই আর গার্মেন্টসের সাথে ওৎপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকার অভিজ্ঞতার আলোকে বর্তমান বিশ্বের ও আমাদের দেশের সার্বিক প্রেক্ষাপটে আমাদের এই প্রাণভোমরা শিল্পটির সামনে শীঘ্রই স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী যেসব চ্যালেঞ্জ আসছে তার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরন দিতে চাই: ১.ব্রেক ইভেন অব ইন্ডাস্ট্রি: আমাদের স্বাধীনতা পরবর্তি মিলিয়ন ডলারের বাজেট আজ অলরেডি ৪ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। একবার যেহেতু ৪ লক্ষ হয়েছে সেটা ইকোনোমির নিজস্ব ধর্ম অনুযায়ী আর ৩ লক্ষ হবার কোনো সুযোগ নেই। বরং এটা ক্রমাগত বড় হতেই থাকবে। এই ভলিউমের একটি ইকোনোমি বড় হতে হতে একসময় তার প্রধান খাতগুলো ব্রেক ইভেনে চলে যায় অর্থাৎ ওই দেশের অর্থনীতির প্রধান খাতগুলো তাদের একক অবদানের দিক দিয়ে ব্রেক ইভেন পয়েন্টে চলে যায়। তারপর আর ওই খাত নির্ভর থেকে ইকোনোমি চলতে পারে না। ইকোনোমিকে তার গতিধারা বজায় রাখতে আরো বেশি সফিসটিকেটেড খাত, সুপার ভ্যালুর খাতে মাইগ্রেট করতেই হয়। তার মানে দাড়াল, বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নিজের টিকে/এগিয়ে যাবার স্বার্থেই একটা পর্যায়ে তার আজকের প্রধান খাতকে পেছনে ফেলে নতুন নতুন অধিকতর লাগসই খাত খুঁজে নিতে হবে। তার মানে দাড়াল গার্মেন্টস শিল্পকে ক্রমাগত সংকুচিত বা আরো অপ্রধান খাতে পরিনত হবার কিংবা ধীরে ধীরে নতুন লাগসই খাতের কাছে পিছিয়ে পড়তে হবে। বিশ্বাস হচ্ছে না? জাপান, ইউএসএ, কোরিয়াকে দেখুন। তারাও তো একসময় গার্মেন্টস করত। আজ তারা সেখানে আছে কি যেখানে তারা আরো ৪০ বছর আগে ছিল? (এরপরও বিশ্বাস না হলে ১৪ জুনের প্রথম আলোতে জনাব বদিউল আলম মজুমদারের এই কলামটি পড়ে দেখতে পারেন-http://epaper.prothom-alo.com/view/dhaka/2017-06-14/11) ২.ইউরোপের জনসংখ্যা হ্রাস: শুনলে হাস্যকর মনে হতে পারে তবে ইউরোপ (যেটি আমাদের গার্মেন্টস রপ্তানীর প্রধান হাব) সেখানকার জনসংখ্যার ক্রমহ্রাস আমাদের জন্য একটি থ্রেট। থ্রেটটি খুব ধীর হলেও স্টেডি। মানুষ কমলে কনজাম্পশন কমবে। তাতে আমাদের অর্ডার ফ্লো কমতে বাধ্য। অনেকে বলবেন, মানুষ কমছে তাতে কী, মাইগ্র্যান্টরাতো গিয়ে সে গ্যাপ পূরণ করছে তো। স্যরি, মাইগ্রান্টরা আমাদের রপ্তানী করা ২৫ ডলারের শার্ট-প্যান্ট কেনার ক্ষমতা খুব কম রাখে। ৩.মজুরীর আপেক্ষিক বৃদ্ধি: আমাদের গার্মেন্টস খাতের বিশ্ববাজারে প্রতিযোগীতা সক্ষমতার একটি অন্যতম প্রধান পজেটিভ চলক হল আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলোর চেয়ে তুলনামুলক আপেক্ষিক কম শ্রম মজুরী। খুব ভাল করে খেয়াল করুন। আমি বলছি না “কম মজুরী” । আমি বলছি “তুলনামুলক আপেক্ষিক কম মজুরী”। এর বাইরে আরো কয়েকটি কমপারেটিভ বিজনেস ড্রাইভার আছে আমাদের যা অন্য কখনো বলব। তো, এই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চলকটি খুব বেশিদিন আর অন্যান্য প্রতিযোগীদের চেয়ে পিছিয়ে থেকে আমাদের কমপারেটিভ কম্পিটিটিভনেস বাড়াবে-সেটা আর জোর গলায় বলা যাচ্ছে না। মজুরী বাড়তে বাড়েতে একটা ব্রেক ইভেনের বাইরে চলে গেলে আমাদের জন্য কম্পিটিশনটা ওপেন হয়ে যাবে। এটিও বাংলাদেশের জন্য বিশাল একটি চ্যালেঞ্জ হতে যাচেছ। ন্যুনতম মজুরী আরো বাড়ানো উচিৎ কিনা-সেটি একটি ডিফারেন্ট ইস্যূ। এখানে আমি শুধু মজুরী বৃদ্ধির শুধু নির্দিষ্ট একটি ইমপ্যাক্ট বোঝানোর চেষ্টা করছি। ৪.একর্ড ও এলায়েন্সের জন্ম বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাতের জন্য অনেক ভাল কিছুর জন্ম দিলেও তা একই সাথে আবার অনেকগুলো অভিশাপেরও দরজা খুলে দিয়েছে। এটা মনে করার কোনো কারন নেই, এই দুটি বেনিয়া জোট আমাদের জন্য বিধাতার দূত হয়ে এসেছে। তাদের নীল দংশনে কিভাবে গার্মেন্টস খাত ধুঁকছে তার বিস্তারিত বর্ণনা এখানে দিলাম না। এই দুটি জোটের সরাসরি ও পরোক্ষ অভিশাপে ঠিক কী কী বিপদ ঘনাচ্ছে তার বিবরন দিতে আরেকটি গল্প লিখতে হবে। শুধু একটা পরিসংখ্যান বলি, বাকিটা আপনি বুঝে নিন। একর্ড ও এলায়েন্সের ছোবলে প্রায় ২৫০ টি চালু কারখানা বন্ধ হয়েছে। তাদের প্রেসক্রিপশনে বাংলাদেশের যতগুলো কারখানা তাদের শ্রমপরিবেশ সংশোধনের তালিকায় আছে তাদের পুরো কাজ বাস্তবায়নে খরচ করতে হবে প্রায় ১০-১৫ হাজার কোটি টাকা। এই টাকার যোগান দেয়া আর তার রিটার্ন পাওয়ার চ্যালেঞ্জ আপনি না মানুন, বাংলাদেশের গার্মেন্টসের সাথে জড়িত এমন নীতিনির্ধারকরা হাড়ে হাড়ে জানেন। ৫.অপরিকল্পিত, অনিয়ন্ত্রিত, দূরদর্শীতাহীন ও কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যাতিত গামেন্টস শিল্প কারখানার সংখ্যাবৃদ্ধি বা বিদ্যমান ইউনিটগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি (উৎপাদনশীলতার সাথে মিশিয়ে ফেলবেন না) এদেশের গার্মেন্টস শিল্পের জন্য অচীরেই তীব্র প্রতিযোগীতা সৃষ্টি করতে যাচ্ছে দেশের ভিতরেই। যার সুবিধা নেবে বায়াররা, বাংলাদেশ নয়। একতো দেশে অর্ডারের পরিমান কমছে। পাশাপাশি সেই অর্ডারও ভাগ হবে, কারন অর্ডার চাই-এমন ক্ষুধার্ত পেট বাড়ছে। ৬.বায়ারদের চাপে প্রতিনিয়ত পোশাকের গ্রস মূল্য কমতে থাকা আমাদের জন্য ভয়াবহতম থ্রেট। যারা বলেন গার্মেন্টস ওনাররা প্রচন্ড রকম প্রোফিট করেন শুধু সেসব অন্ধদের জ্ঞাতার্থে বলি, আমাদের বার্ষিক টার্নওভার যদি ১০০ টাকা হয় তাহলে তার ৬৫ টাকাই কাঁচামালের দাম বাবদ বিদেশী সাপ্লায়ারকে দিয়ে দিতে হয়। বাকি ৩৫ টাকা হতে যাবতীয় খরচ (বেতন, বোনাস, ভাঙচুর ব্যায়, ঘুষ, কন্সট্রাকশন, অপচয় এমনকি টয়লেট পেপারের দাম ইত্যাদি) মেটাতে হয়। গার্মেন্টস একমাত্র ব্যবসা যেখানে প্রতিটি SPI অর্থাৎ প্রতিটি স্টিচ বা সুঁইয়ের ফোড় হিসাব করে পয়সা আয় করতে হয়। ৭.যে ভলিউমে ও গতিতে আমাদের গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি কলেবরে বেড়েছে তার সাথে তাল রেখে বাড়েনি ব্যাকওয়ার্ড ও ফরোয়ার্ড লিংকেজ। ফলে হাইপোথাইরয়ডিজমের রোগীর মতো আমাদের ব্যাসিক কাট টু প্যাক শিল্প টিপিক্যালী যাকে দেশের মানুষ ”গার্মেন্টস” নামে চেনে তার মাথা হচ্ছে বিশাল কিন্তু হাত পা অবয়ব বড় হয়নি। পরিণতি তো বুঝতেই পারছেন। সামাল দিতে গিয়ে লাভের গুড় পিপড়েকে দিতে হচ্ছে মানে টোটাল টার্নওভারের একটা বড় অংশ বিদেশী র ম্যাটেরিয়াল সাপ্লাইয়ার ও বিদেশী কনসালট্যান্ট/এক্সপার্টকে দিয়ে দিতে হচ্ছে। এই বিদেশ নির্ভরতা আমাদের প্রতিযোগীতার সক্ষমতার আবার এক বড় প্রতিবন্ধক যেটার নাম লীড টাইম। আমাদের লীড টাইম চায়নার দ্বিগুন হলে আমরা কী করে চায়নার সাথে টিকব? ৮.শুনতে স্বার্থপর মনে হতে পারে তবু বলছি। দেশের শিক্ষার হার যত বাড়বে তত গার্মেন্টস খাত রিলেটিভ নেগেটিভ ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টরের শিকার হবে। কেন? এই খাতের মূল প্রাণশক্তি কিন্তু এখানকার অশিক্ষিত লেবার শ্রেণী যারা মুলত প্রোডাকশন করে। শিক্ষার হার ও সুযোগ যত বাড়বে তত এই খাতে শ্রমিক সরবরাহ কমবে। তার উপর সরকার এখন মেয়েদের (যারা গার্মেন্টসের প্রধানতম ম্যানপাওয়ার) তাদের ডিগ্রি পর্যন্ত স্টাইপেন্ড/সাবসিডি/খরচ দিচ্ছে বা দিতে যাচেছ। এতে তাদের গার্মেন্টসে আসা কমবে। শিক্ষিত মানুষ নিশ্চই কাতারে কাতারে গার্মেন্টস শ্রমিক হতে চাইবে না। এই মুহুর্তে এমনিতেই এখানে ঘাটতি আছে ১০-১৫ লাখ শ্রমিকের। সেটা যদি আরো বাড়তে থাকে (শিক্ষার হার বাড়ায় আর নতুন কারখানা বাড়ায়) তবে আমাদের প্রোডাকশন ব্রেক ইভেনের ধাক্কায় পড়বে। ৯. অদ্ভুৎ মনে হলেও একটা সত্যি কথা বলি। দেশের ক্রমাগত অর্থনৈতিক অগ্রগতিও গার্মেন্টসের জন্য একধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরী করছে। ভাবুনতো, আপনি যত ধনী হবেন, গামেন্টস শিল্প হতে ততই কি আপনি আগ্রহ হারিয়ে আরো তুলনামুলক আকর্ষনীয় বা আপাতঃ প্রেস্টিজিয়াস পেশায় যেতে চাইবেন না? এতে করে গার্মেন্টস তার কোয়ালিটি ম্যানপাওয়ার দিন দিন আরো হারাবে। মানতে পারলেন নাতো? ধরেন আমাদের অর্থনীতি জাপানের মতো বড় হল। তো বাঙালী একজন নাগরিক যার পার হেড ইনকাম গড়ে ১৬০০ ডলার হতে বেড়ে ১৬,০০০ ডলার হয়ে গেল তিনি কি আজকের মতো এত সহজে গার্মেন্টসে (আই মিন কারখানা শিল্পে) কাজ করতে চাইবেন? আরো উদাহরন দেই। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো কেন তৃতীয় বিশ্ব হতে শ্রমিক নেয়? একটু দু’য়ে দু’য়ে চার মিলান। আপনারা জানেন কিনা জানি না। গার্মেন্টসের ৫০-৫৫ লাখ শ্রমিকের প্রায় ৮০ ভাগ নারী অথচ এখানকার নিয়ন্ত্রক স্ট্যাফদের প্রায় ৯৫ ভাগ পুরুষ। কেন জানেন? ইনিশিয়ালী মেয়েরা এই পেশায় এলেও তারা বেশ কয়েক বছর চাকরী করে নিজেদের দক্ষতার বেস্ট সময়টাতে চাকরী ছেড়ে সংসারী হয়ে যায় নানান বাস্তবতায়। ফলে বেস্ট এফিশিয়েন্ট ম্যানপাওয়ারের অপটিমাম সার্ভিস বঞ্চিত হয় সেক্টর। ইকোনোমিক গ্রোথ এই খাতে ম্যানপাওয়ার সাপ্লাইয়ের বিদ্যমান ঘাটতিকে আরো বাড়াবে। ১০.ইমেজ সংকট: আপনি হয়তো মানবেন না। তবু বলছি, এই দেশে তথাকথিত জ্ঞানী, বিশেষজ্ঞ আর ক্রেজি দেশপ্রেমিক মানবতাবাদীদের সংখ্যা ও তাদের নির্বোধ প্রেশারগ্রূপ এফেক্ট গার্মেন্টস সেক্টরের জন্য অশনী সংকেত। নানান চেষ্টা স্বত্বেও এই গ্রূপটার কারনে গার্মেন্টস বিরাট ইমেজ সংকটে আছে যা আমাদের প্রতিযোগীতা সক্ষমতাকে আরো কমাবে। এরা ইকোনমি বা ইন্ডাস্ট্রির কিছু বুঝুক বা না বুঝুক, অষ্টপ্রহর গার্মেন্টস শিল্পের যতরকম নেগেটিভ নিউজ, ডিসকাশন করা যায় করে যাবে। এতে করে কেউ যদি উপকৃত হয় সেটা হচ্ছে আমাদের প্রতিযোগী দেশসমূহ-ভিয়েতনাম, ভারত, কম্বোডিয়া, চায়না ও অন্যান্যরা। এক হলি আর্টিজেন কান্ডে পরবর্তি কয়েকমাসে কত পরিমান অর্ডার শিফটিং হয়েছে সেটা আমরা জানি। ১১.সেই আশির দশক হতে শুরু করে আজকে গার্মেন্টসের ভলিউম কত হয়েছে নিশ্চই জানেন? বিজিএমইএ লক্ষ্য নির্ধারন করেছে ২০২১ সাল নাগাদ এই খাতের রপ্তানী আয় ২৮ বিলিয়ন হতে ৫০ বিলিয়নে নিয়ে যাবে। নিশ্চই তা হবে। তবে বর্তমানের প্রেক্ষিতে একটু মিলিয়ে নিই। গার্মেন্টস সেক্টরের তিনটি প্রধানতম চ্যালেঞ্জ যদি আমি বলতে চাই তবে তার একটা অবশ্যই হবে মানবসম্পদের ঘাটতি। শ্রমিকের তো ঘাটতি আছেই। তার সাথে আরও আছে যোগ্য, দক্ষ, স্মার্ট, ভিশনারী, কারিগরি, ম্যানেজমেন্ট কর্মীর ঘাটতি। ভাল করে শুনবেন-ঘাটতি আছে বলেছি, টোটাল অনুপস্থিতি আছে বলিনি। এই খাতকে নেতৃত্ব দিয়ে তাকে ৫০ বিলিয়নের বন্দরে পৌছাতে যে পরিমান ও যেই টোটাল ক্যালিবারের হিউম্যান রিসোর্স দরকার তা আমাদের নেই আর তা তৈরীর কোনো নিশ্চিত ব্যবস্থাও আমরা এখনো করতে পারিনি। তো কারা নেতৃত্ব দেবে আমাদের ম্যানডেটরি ম্যাসিভ গ্রোথ রিকয়ারমেন্টকে? ১২.যদি আপনি মৌলিক ইকোনমি বুঝে থাকেন তাহলে নিশ্চই জানবেন, প্রতিটি অার্থিক খাত বা চলককে টিকে থাকতে হলে নির্দিষ্ট ও ধারাবাহিক মার্জিনাল গ্রোথ রেট ধরে এগোতে হয়। আমাদের বিজনেস ডাটা বলছে, বিগত ৫ বছর ধরে আমাদের এই খাতের মার্জিনাল গ্রোথ রেট হ্রাস পাচ্ছে। ৫ বছর আগে যা ছিল 6-7% সেটা ২০১৭ তে মাইনাস রেটে যা ভয়ঙ্কর ভীতিপ্রদ। ১৩.এবার যেটির কথা বলব সেটি বলার পর বহু প্রগতিবাদী ও সমাজসেবক আমাকে গালি দিতে নেমে পড়বেন। তবু বলছি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ইউএসএ যারা আমাদের গার্মেন্টস পণ্যের সিংহভাগের ক্রেতা তারা ক্রমাগতভাবে গার্মেন্টসে ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার জন্য চাপ তৈরী করছে। ট্রেড ইউনিয়ন ইস্যুতে (সাথে আরো কিছু ফালতু ইস্যুতে) ইউএসএ ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা স্থগিত করে রেখেছে বছর তিনেক। ইইউও সেই রাস্তায় হাটছে। জিএসপি না থাকায় আমাদের প্রতিযোগীতা সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। আবার ওটা পেতে গেলে ইউনিয়ন দিতে হবে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ট্রেড ইউনিয়ন একদমই আশির্বাদ বয়ে আনবে না। বরং (বিশ্বাস করুন) ট্রেড ইউনিয়ন বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের কফিনে শেষ পেরেক ঠোকা হবে। ইউনিয়ন করার মতো ম্যাচিওরড কর্মীবাহিনী আমাদের তৈরী হয়নি। আগে শিল্পটাকে বাঁচান। তারপর দেখা যাবে এর ফাইন টিউনিং। আমি ১৩টি বললেও আসলে আরো অসংখ্য চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। এতক্ষণের আলোচনার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত গার্মেন্টস উদ্যোক্তাগণ, উদীয়মান উদ্যোক্তাগন, সিনিয়র পলিসি মেকারগণ, উচ্চ পদস্থ কর্মীবৃন্দ এবং হবু উদ্যোক্তাগণ বলতে পারেন, এগুলো অতিশয় কল্পনা বা বাস্তবতাবিবর্জিত। অথবা ভাবতে পারেন এইসব থ্রেট ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই আমরা বিগত ৪০ বছর টিকে আছি। হ্যা আছি, আরো কিছুদিন থাকবও (আমি কামনা করি যেকোনো উপায়ে হোক আমরা আরো শতবছর টিকে থাকবই) তবে অতীতের যেকোনো সময়ে এইসব চ্যালেঞ্জের গুরুত্ব ও চাপ, পোষ্ট রানাপ্লাজা-শারমিন ইস্যু আর একর্ড এলায়েন্স যুগের মতো ছিল না। উপরের প্রতিটি চ্যালেঞ্জ অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে মোকাবেলা করা আরো প্রচন্ড চ্যালেঞ্জিং হয়ে যাবে। এখন প্রশ্ন হল, আমরা এটা মোকাবেলা করব কিভাবে? কিভাবে করব সেটা বলার আগে এটা আগে স্বীকার ও বিশ্বাস করতে হবে যে, থ্রেট ও চ্যালেঞ্জটি সত্যিই আসছে এবং তার কামড় খুব প্রচন্ড হবে। তাহলেই আমরা সেটিকে সত্যিকার ও সিরিয়াসলি মোকাবেলা করতে পারব, অন্তত চেষ্টা করতে পারব। আমি যেহেতু বড় বড় থিংক ট্যাঙ্ক সংগঠনের একাডেমিশিয়ান বা প্রথাগত গবেষক নই, তাই সমাধানের উপায়গুলোও হয়তো প্রথাগত ও গোছালো বলতে পারবনা। খুব সংক্ষেপে বলছি:- বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাতকে তৈরী হতে হবে। সবদিক হতে। বিশ্বের বাজারে যত শক্ত প্রতিযোগী আছে তাদের সাথে আমাদের প্রতিযোগীতার সক্ষমতা বাড়াতে হবে সবক্ষেত্রে। আমাদের যতটুকু আছে তার থেকে অপটিমাম ব্যবহার করতে হবে। প্রচুর এনার্জি, মানি, টাইম ও অপর্চুনিটি ওয়েস্টেজ হয় আমাদের। সেটাকে ভার্চুয়ালী শুন্যের কোঠায় আনার লক্ষ্য নির্ধারন করতে হবে। যেকোনো প্রকারেই হোক, ম্যানপাওয়ার সাপ্লাইয়ের ঘাটতি পুরন করতেই হবে-লেবার ও ম্যানেজমেন্ট কর্মী-দুটোই। গার্মেন্টস সেক্টর লেবার ইনটেনসিভ খাত। এখানকার উন্নতির যেকোনো উদ্যোগের মুলেই হল ম্যানপাওয়ারের সক্ষমতা। একটি গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠান এক্ষেত্রে এককভাবে কী করতে পারবে? হ্যা, বিপদ তো তার একারও আছে তাই তার এককভাবেও অনেক কিছু করবার আছে। তাকে প্রথমেই বিপদ আসছে-সেটা রিয়েলাইজ করতে হবে, বিপদের ধরন ও কারন বুঝতে হবে, নিজের ইন্টেলেকচুয়াল ও টেকনিক্যাল-উভয় ধরনের ম্যানপাওয়ারকে সিংক্রোনাইজড ও ডেটোনেট করতে হবে সব প্রিপারেশনসহ (বিপদ আসার অনেক আগে)। প্রোএকটিভ ব্যবস্থা নিতে হবে, ওয়েস্টেজ আটকাতে হবে, ব্রান্ডিং করাতে হবে নিজের। আমি খুব সংক্ষেপে এইচআর প্রফেশনাল হিসেবে বলব, আপনি অত্যন্ত স্মার্ট, হাইলি কোয়ালিফাইড এবং প্রফেশনাল কর্মী হায়ার করুন। তারাই যা করার করবে অটোমেটিক্যালি। এ্যামেচার আর হাতুড়েদের দিয়ে গার্মেন্টস আর চলবে না। মনে রাখতে হবে, সারভাইভাল ফর দি ফিটেষ্ট। তবে আমি একটি নিজস্ব বিশ্বাসকে (অবৈজ্ঞানিক শোনাবে হয়তো) সবশেষে বলব এই আসন্ন দুর্যোগ হতে বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাতের যুদ্ধজয়ের সর্ববৃহত হাতিয়ার। সেটা হল, এক;গার্মেন্টস সেক্টর ও এর যোদ্ধাদের লড়াকু স্বকীয়তা, অতীত সাফল্য। দুই ও সবচেয়ে ভাইটাল; বাঙালী কোনদিন কারো কাছে নত হয়নি। বাংলাদেশকে হারানো গেছে, পরাজিত করা যায়নি-এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় মন্ত্র। এমপিদের কাজ আইন প্রণয়ণ, জাতীয় ইস্যুতে বির্তক-আলোচনার মধ্য দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নীতি প্রণয়ণসহ নানা দায়িত্ব। কিন্তু এদেশে অনেক এমপি দিনের পর দিন, বছরের পর বছর সংসদেই আসেন না। এমপিরা দিনে দিনে স্থানীয় সরকারের কর্তৃত্ব নিজেদের হাতেই পুরছেন না, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের এলাকার উন্নয়ন ও বরাদ্দের জন্য তাদের পিছে হাঁটতে হচ্ছে। এমনকি একজন সংসদ সদস্যের প্রাপ্ত মর্যাদাশীল ভাবমূর্তি থেকে সরে গিয়ে এলাকার উন্নয়ন কাজের টেন্ডার থেকে হাট, মাঠ, ঘাটের ইজারা নিয়ন্ত্রণ করছেন। নতুন করে এমপিরা এখন খালি মাটি কাটেন। সেই মাটি কাটা আর মাটি বহনের ছবি মোবাইলে তুলে কর্মীদের দিয়ে ফেসবুকে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের মাটি কাটা রাজনীতি এদেশে বহু পুরাতন। ঝুড়ি- কোদাল নিয়ে মাঠে নামার এই নাটক মেজর জিয়া অনেক আগেই করে ফেলেছেন। ভোট আসছে, সস্তা জনপ্রিয়তা আদায়ে বা মন জয় করতে যে এই কার্যক্রম তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু অর্থ, পেশীশক্তি ও আর্শিবাদ লাভের রাজনীতিতে গা ভাসিয়ে রাজনীতিকে রাজদুর্নীতিতে পরিণত করা এমপিরা এভাবে জনগণের কাজের সময় নষ্ট করে সস্তা পাবলিসিটি না করে যদি নিজেদের নির্ধারিত কাজে মনোযোগী হন সেটাই দেশ ও জাতির জন্য মঙ্গলজনক হবে।